বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যেতে কীভাবে প্রস্তুতি নিবেন? সম্পূর্ণ রোডম্যাপ 

প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশে যান। মন চাইলেই হুট করে বিদেশে পড়তে যাওয়া যায় না। এজন্য তাকে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি নিতে হয়। আজকে আপনাদের জন্য থাকছে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যেতে কীভাবে প্রস্তুতি নিবেন? 

বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীকে প্রথমেই ঠিক করতে হবে তিনি কোন দেশে যাবেন। কেননা, একেকটি দেশের পড়াশোনা, খরচ, ভর্তি চাহিদায় পার্থক্য আছে। এছাড়াও আরো আনেক ব্যাপার আছে যেগুলা না জানলেই নয়। তাহলে চলুন দেখে নেওয়া যাক উচ্চশিক্ষায় বিদেশ যেতে একজন শিক্ষার্থীর কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। 

যেসব প্রস্তুতি দরকার হবে উচ্চশিক্ষায় বিদেশ যাওয়ার জন্য

দেশ বাছাইয়ের পরে ঠিক করতে হবে যে, আমার সাবজেক্ট ও আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে মিলিয়ে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া যেতে পারে। এক্ষেত্রেও একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম বা চাহিদা, টিউশন ফির সঙ্গে আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য থাকে।

যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশে সেপ্টেম্বরে ভর্তি সেশন শুরু হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে অন্তত এক বছর আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করা উচিত। বিশেষ করে ইংরেজির ভর্তি চাহিদা যেমন, আইইএলটিএস বা অন্যান্য চাহিদা প্রস্তুতি করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ, আবেদন ইত্যাদি অন্তত একবছর আগে থেকে শুরু করতে হবে।

যে বিষয়ে পড়তে চান, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। সেই সঙ্গে দেখতে হবে আপনার আর্থিক সামর্থ্য এবং পছন্দের সঙ্গে মিলছে কিনা। বিদেশে উচ্চশিক্ষা পেতে একজন শিক্ষার্থীকে যেসব প্রস্তুতি নিতে হবে। 

সবার আগে ভাষা দক্ষতার প্রমাণ প্রয়োজন

যেমন আইইএলটিএস, টোফেল, স্যাট অথবা জিআরই। একেকটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে এসব চাহিদার পার্থক্য থাকতে পারে।

অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় দেশগুলোর বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইইএলটিএসে ব্যান্ড স্কোর অন্তত ৬ থাকা দরকার। তবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এর চেয়ে বেশিও চাইতে পারে। তবে আমেরিকাসহ আরো দেশের কোন কোন সাবজেক্টে টোফেল, স্যাট বা জিআরই দরকার হতে পারে।

জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, নরওয়ের মতো ইউরোপীয় দেশে পড়তে গেলে যেমন ইংরেজিতে পড়াশোনা করার সুযোগ রয়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে সেই দেশের ভাষার দক্ষতা দরকার হতে পারে। বিশেষ করে জার্মানির মতো দেশে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ নিতে হলে জার্মান ভাষা জানতে হবে।

ভাল একটা পড়াশোনার ফলাফল থাকলে সুবিধা পাওয়া যাবে

বাংলাদেশে পড়াশোনার ফলাফলের ওপর ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের বা বিষয়ে ভর্তির ব্যাপারটিও অনেক সময় নির্ভর করে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেইল করেও পরামর্শ চাওয়া যেতে পারে। প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ফ্যাকাল্টি কো অর্ডিনেটর থেকে ইমেইল করে বিস্তারিত সবকিছু জেনে নিতে পারবেন। অনেক সময় ইংরেজি দক্ষতার ব্যান্ডস্কোরও ভর্তি বা বিষয় পাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

পড়ুনঃ বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার সুবিধা এবং অসুবিধা কি? 

বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া যেভাবে হয় 

বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় বাছাই করার পরে অনলাইনের মাধ্যমে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে হবে।

নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ইত্যাদি দেশের কেন্দ্রীয় ভর্তি ব্যবস্থাপনার ওয়েবসাইট আছে। সেখানে আবেদন করলে আপনার যোগ্যতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় বেছে দেয়া হয়। এছাড়াও বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে যেখান থেকে আপনি ভর্তি সম্পর্কিত যাবতীয় সব তথ্য সেখানে পেয়ে যাবেন। 

তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়।

সেখানে পড়াশোনার সকল সনদ কাগজপত্র স্ক্যান করে তুলে দিতে হতে পারে। পাশাপাশি এসব সেগুলোর ফটোকপি কুরিয়ার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানায় পাঠাতে হতে পারে।

সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবেদন গ্রহণ বা বাতিলের সিদ্ধান্ত ই-মেইলের মাধ্যমে জানানো হয়।

আবেদনপত্র গ্রহণ করা হলে ভিসা আবেদনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণপত্র অথবা ব্যংক স্টেটমেন্ট 

ভিসা আবেদনের সময় আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণ দেখাতে হবে। প্রায় সব দেশেই শিক্ষার্থী ভিসার ক্ষেত্রে দূতাবাস কর্মকর্তারা দেখতে চাইবেন যে, শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার খরচ সে বহন করতে সক্ষম।

দেশ ভেদে টিউশন ফি হিসাবে অন্তত বছরে অন্তত ১০/১২ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ২০/২২ লাখ টাকা খরচের সামর্থ্য থাকতে হবে। এর সঙ্গে শিক্ষার্থীর থাকা-খাওয়া, যাতায়াত, পোশাক, হাতখরচ, চিকিৎসা যোগ করতে হবে। লন্ডনের ক্ষেত্রে যেমন এক্ষেত্রে বছরে আরো অন্তত ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে। এই খরচের টাকা ব্যাংক হিসাবের অথবা ব্যংক স্টেটমেন্ট এর মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।

অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিস্টারের ফি অগ্রিম পরিশোধ করতে হয়।

অনেক দেশে স্বাস্থ্য বিমা থাকা বাধ্যতামূলক। সেটি অবশ্য বাংলাদেশের বিভিন্ন বিমা এজেন্সি করে থাকে, যেসব এজেন্সির নাম দূতাবাসের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।

আবাসন 

সব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের পূর্বেই জানাতে হবে যে, তারা সেই আবাসন সুবিধা নিতে চান কি না। অথবা শিক্ষার্থীরা চাইলে নিজেরা আলাদাভাবে বাসা ভাড়া করেও থাকতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত নিজেদের রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে।

বৃত্তি বা স্কলারশিপ এর জন্য আবেদন

আবেদনের সময় উল্লেখ করতে হবে যে বৃত্তি নিতে চান কিনা। একই সময় বৃত্তির জন্যই প্রস্তুতি নিতে হবে।

ভারত, তুরস্ক, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারিভাবেই নানা ধরনের বৃত্তি রয়েছে।

এরকম বিখ্যাত কয়েকটি বৃত্তি হলো জাপানের মনবুশো বৃত্তি ও মনবুকাগাকুশো বৃত্তি, , এমএইচটিটি স্কলারশিপ প্রোগ্রাম, জার্মানির ডিএএডি, অস্ট্রেলিয়ার ডেভেলপমেন্ট স্কলারশিপ, যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ স্কলারশিপ, শেভেনিং স্কলারশিপ, যুক্তরাষ্ট্রের ফুলব্রাইট ফরেন স্টুডেন্টস প্রোগ্রাম, কানাডার হাম্বার ইন্টারন্যাশনাল এন্ট্রান্স স্কলারশিপ ইত্যাদি। এছাড়া প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীদের পূর্ণ বা আংশিক বৃত্তির সুযোগ রয়েছে। 

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ওয়েবসাইটের বিভিন্ন দেশের দূতাবাস বা সরকারি বৃত্তির নোটিশ পাওয়া যাবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনলাইনেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে বৃত্তির আবেদন করা যেতে পারে।

উচ্চ শিক্ষায় বিদেশ যেতে ভিসা আবেদন কখন করবেন? 

ভিসা আবেদনের সময় আবেদন পত্রের কাগজপত্রের মধ্যে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির অফার লেটার থাকতে হবে। এর সঙ্গে শিক্ষার্থীর আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, অর্থাৎ ব্যাংক হিসাবে নিজের নামে বা গ্যারান্টারের নামে পর্যাপ্ত অর্থের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষার্থী ভিসার ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত থাকতে পারে।

আরও পড়ুনঃ যেই বিদেশি ভাষা শিখে দেশে ভাল ক্যারিয়ার গড়তে পারবেন

কি কি কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে?

এইচএসসির পর বিদেশে পড়তে যেতে চাইলে প্রথমেই দেখতে হবে আপনার সব প্রয়োজনীয় একাডেমিক কাগজপত্রসহ যাবতীয় ডকুমেন্টস ঠিকঠাক আছে নাকি। কোনো ডকুমেন্ট বাদ পড়ে গেলে তা বানিয়ে নিতে হবে অথবা সেই সংক্রান্ত অফিস থেকে সংগ্রহ করে নিতে হবে৷ নিজের আপডেটেড সিভি ও কাভার লেটারসহ সব শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র ইংরেজিতে করিয়ে নিতে হবে। আবেদনের ক্ষেত্রে মূলত:

  • পাসপোর্ট
  • জম্ম নিবন্ধন সার্টিফিকেট
  • জাতীয় পরিচয়পত্র (যদি থাকে)
  • এইচএসসি এর ক্ষেত্রে এসএসসি এবং এইচএসসি-র সার্টিফিকেট, ট্রান্সক্রিপ্ট এবং টেস্টিমোনিয়াল
  • এবং মাস্টার্স এর ক্ষেত্রে ব্যাচেলর এর ট্রান্সক্রিপ্ট, সার্টিফিকেট ও টেস্টিমোনিয়াল
  • ইউরোপ সাইজ পাসপোর্ট সাইজের ছবি
  • স্টেটমেন্ট অব পারপাস (SOP) লেটার
  • লেটার অব মোটিভেশন
  • লেটার অব রিকমেন্ডেশন
  • IELTS / TOEFL / GRE ভাষাগত দক্ষতার সার্টিফিকেট
  • ব্যাংক স্টেটমেন্ট অথবা ব্যাংক সল্ভেন্সি এবং স্পন্সর এর ডকুমেন্ট 

আবেদনের সময় অবশ্যই কী কী ডকুমেন্ট চাওয়া হয়েছে তার লিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে দেখে নেবেন । 

ছবি এবং প্রয়োজনীয় সকল ফটোকপি অবশ্যই সত্যায়িত করে নিতে হবে। প্রথমে শিক্ষা বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এর পর বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ শাখা থেকে সকল কাগজ পত্রের মূলকপি দেখানো সাপেক্ষে বিনামূল্যে সত্যায়িত করা যায়। এছাড়া নোটারি পাবলিক থেকেও সত্যায়িত করা যায়। ভর্তির কাজ অনলাইনে হলেও অনেকক্ষেত্রে কিছু ডকুমেন্টের হার্ডকপি আপনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কুরিয়ার করে পাঠাতে হবে।

ফার্মাসিউটিক্যালস চাকরি কেমন? নতুনদের চাকরির সুযোগ সবচেয়ে বেশি

Leave a Comment