বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার সুবিধা এবং অসুবিধা কি? 

বর্তমানে ইয়ুথ শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান অনেকে। পেশাগত জীবনে উন্নতির আশায় অনেকেই বিদেশে পড়তে যেতে চান। কেউ কেউ ফেলোশিপ ও বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান। আবার অনেকে নিজ পকেটের টাকা খরচ করে পড়তে যান। বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ আপনার শিক্ষার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য ভূমিকা পালন করবে। নতুন সংস্কৃতি জীবনে নানা অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করবে। বিদেশে পড়াশোনা ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ফেলে। বিদেশে পড়তে যাওয়া ক্যারিয়ারের পথ নির্দেশনাও তৈরি করে দেয়। এখন বিদেশে পড়াশোনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুবিধা এবং অসুবিধার কথা তুলে ধরা হলো-  

উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বিদেশে যাওয়ার সুবিধা?

শিক্ষা ব্যবস্থাটি এমন একটি ক্ষেত্র যা সবসময় প্রসারণশীল। যুগে যুগে শিক্ষার ক্ষেত্রে কখনই নির্দিষ্ট গন্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং দেশ, কাল, জাতি, সংস্কৃতি প্রভৃতির মাঝে বিস্তৃতিই শিক্ষার মৌলিক ক্ষেত্র ও সীমানা হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিস্তৃত এই ক্ষেত্র ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণেই বর্তমানে শিক্ষার্থীরা বিদেশমুখি হচ্ছেন। গবেষণা-মুখী শিক্ষা, পর্যাপ্ত পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা, রেসিডেন্সি পারমিট পাওয়ার সম্ভাবনা, নিজ ভবিষ্যৎ জীবনকে সুন্দর করার লক্ষ্যে আজকাল অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পাড়ি দিচ্ছেন বিদেশে।

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য

বিদেশে পড়তে যাওয়ার একটা বড় সুবিধা হল নানা রকম সংস্কৃতির মানুষের সাথে পরিচিত হওয়া যায়। সাধারণত বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে অনেকেই পড়তে আসে। সেক্ষেত্রে দেখা যায় যে যারা বিদেশে পড়তে যায় তারা নানারকম সংস্কৃতির মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। এর ফলে ওইসব সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক এবং নিয়মনীতি সম্পর্কে জানা যায়। তাছাড়া তাদের চোখে নিজের দেশের সংস্কৃতি কেমন তা সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। 

পেশাগত সুযোগ–সুবিধা

বিদেশে পড়াশোনায় নিজের ক্যারিয়ার গঠনে সুবিধা মেলে। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক নানা বিষয়ে অভিজ্ঞ, সবার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সচেতন ও স্বাধীনচেতা প্রার্থীকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে। আর যোগাযোগের সুবিধাও তো আছেই। কারণ, বিদেশে পড়ার কারণে সংশ্লিষ্ট নানা পেশাদার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ গড়ে উঠবে।

আত্মনির্ভরশীলতা

বিদেশে পড়ালেখা করতে গেলে যেটা হয় যে পরিবারের শাসনের মাঝে থাকতে হয় না। এর ফলে তুমি নিজেকে আবিষ্কার করার সুযোগ পাবে। তোমার নিজের কাজগুলো নিজেকেই করতে হবে। যেমন- নিজের রুম পরিষ্কার রাখা, হিসাব করে চলা, যেকোন বিপদে পড়লে তা থেকে নিজে নিজে উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা করা ইত্যাদি। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে উঠে যেটা পরিবারের সাথে থাকলে অনেক সময় গড়ে উঠে না। এভাবে প্রবাসজীবন একটা মানুষের মাঝে পরিবর্তন এনে তাকে পরবর্তী জীবনের জন্য তৈরি করে তোলে।

ব্যক্তিগত উৎকর্ষ

বিদেশে পড়াশোনার কারণে নানা পরিবর্তনমূলক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে আপনাকে। এতে ব্যক্তিগত উন্নতি ঘটবে। নতুন নতুন বৈচিত্র্যময় চ্যালেঞ্জ নিতে শিখবেন, স্বাধীনতা, সহনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের উন্নতি ঘটবে। নতুন নতুন বিষয়ে মনোযোগ ও আগ্রহ বাড়বে। বিশ্বের নানা দেশের মানুষের সঙ্গে জীবনব্যাপী বন্ধত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠার অবরিত সুযোগও আছে।

বৈচিত্র্যপূর্ণ নেটওয়ার্ক

যেহেতু বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে, সেহেতু বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে নেটওয়ার্ক গড়ে উঠে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে টিমওয়ার্কের মাধ্যমে পড়ালেখা করতে হয়, সুতরাং নানা দেশের শিক্ষার্থীদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়। পড়ালেখা শেষ করেও তাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারলে পরিচিত মানুষের একটি সমৃদ্ধ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যায় যা চাকরিজীবনের তথা জীবনের বিভিন্নক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে।

একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব

বিদেশে পড়াশোনা আপনার শিক্ষাগত মর্যাদা বাড়াতে ব্যাপক সুযোগ এনে দেবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন নতুন বিষয়ে গবেষণার সুযোগ করে দেয়। আর বিশ্বমানের শিক্ষকদের কাছ থেকে সেবা নেওয়ার সুযোগ তো থাকছেই।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিষেশজ্ঞরা বলেন, নির্দিষ্ট ও বিশেষ ক্ষেত্রে শিক্ষা গ্রহণের সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে নিজ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকে না। তাই বিদেশে পড়ার সুযোগ গ্রহণ করা উচিত।

সবশেষে বলা যায় বিদেশে পড়াশোনার অবিশ্বাস্য সুযোগ ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

ক্যারিয়ারের নতুন দিক

বিদেশে পড়তে গেলে অনেক নতুন নতুন কাজের সাথে পরিচিত হওয়া যায় যেগুলো নিজের দেশে পাওয়া যায় না। কাজগুলো তোমার জন্য শুধুমাত্র নতুনই নয়, তুমি সেই কাজের প্রতি আগ্রহও খুঁজে পাবে। এভাবে তুমি ক্যারিয়ার হিসেবে অনেকগুলো পথের মধ্য থেকে একটি বেছে নিতে পারবে। এটি একটি বড় সুযোগ কারণ এতে করে নিজের পছন্দের কাজকেই ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেয়া যায়। দেশে থাকলে এই সুযোগ কম কারণ দেশে ক্যারিয়ার নির্বাচনের ক্ষেত্রে এরকম উন্মুক্ত সুযোগ পাওয়া যায় না।

ভালো চাকুরীর সুযোগ

যদি তোমার ইচ্ছা থাকে দেশে চাকুরী করা, সেখানেও বিদেশে পড়ালেখা করার একটা সুবিধা আছে। বিদেশের কোন ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা করলে তা তোমার সিভিতে প্লাস পয়েন্ট যোগ করবে। ফলে দেশেও এসেও তুমি ভালো প্রতিষ্ঠানে ভালো চাকুরীতে অপেক্ষাকৃত সহজে যোগদান করতে পারবে। আর বিদেশে থাকাকালীন তুমি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছ তার সঠিক ব্যবহার করে নিজের ক্যারিয়ারে দ্রুত উন্নতি করতে পারবে।

ঘুরাঘুরি আর এডভেঞ্চারের সুযোগ

যারা আমার মত ঘুরাঘুরি করতে পছন্দ কর তাদের জন্য বিদেশে পড়তে যাওয়া তো একেবার সোনায় সোহাগা। সম্পূর্ণ নতুন একটি দেশে ভ্রমণ করার সুযোগ তো সহজে পাওয়া যায় না। পড়ার জন্য যদি বিদেশে যাও তো পড়ার পাশাপাশি ঘুরাঘুরিটাও ভালোমত করতে পারবে। এতে করে তোমার ভ্রমণপিপাসু মনও বেশ শান্তি পাবে।

দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ

বিদেশের নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার পাশাপাশি তোমার নানারকম দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে বিদেশে পড়ালেখা। নানাকরম মানুষের সাথে কাজ করা, তাদের সাথে মানিয়ে চলা, তাদের মধ্যে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা ইত্যাদি বিভিন্ন কাজে তোমার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে চাকুরী করার ক্ষেত্রে বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রথম পছন্দ কিন্তু তুমিই হবে।

এ তো গেলো সুবিধার কথা। সব কিছুরই সুবিধা অসুবিধা আছে, বিদেশে পড়তে যাওয়ার কিছু অসুবিধাও আছে। চলো এবার দেখে আসি অসুবিধাগুলো-

পড়ুনঃ যেই বিদেশি ভাষা শিখে দেশে ভাল ক্যারিয়ার গড়তে পারবেন

বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার অসুবিধা

দেশের বাহিরে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার স্বপ্ন থাকে অনেকেরই। কিন্তু এই স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে যখন বিদেশে গিয়ে মানুষ প্রত্যাশার সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে না পায়। এজন্য আমাদের সকলেরই উচিত আগের সব সুবিধা-অসুবিধা খুঁটিয়ে দেখা, অসুবিধাগুলোর সাথে মানিয়ে নিতে পারবো কি না তা দেখা। এই সবকিছু ভেবে বিদেশে পড়ালেখার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। তাহলেই সুবিধাগুলোর সঠিক ব্যবহার আর অসুবিধাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

নতুন পরিবেশ

বিদেশে পড়তে গেলে সর্বপ্রথম যে অসুবিধা হয় তা হল নতুন পরিবেশে মানিয়ে চলার অসুবিধা। একদমই আলাদা খাদ্যাভ্যাস, আলাদা আচার-আচরণ, আলাদা ভাষা, মোটকথা একেবারে আলাদা একটি পরিবেশে গিয়ে পড়বে তুমি। সেখানে তুমি একরকম, আর অন্যরা অন্যরকম। ফলে তাদের সাথে কথাবার্তা বলতে, মানিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরণের অসুবিধায় পড়তে হয়।

একা একা লাগা

বিদেশের নতুন পরিবেশে যখন মানিয়ে নেয়া কষ্টকর মনে হবে তখনি তুমি নিজের আগের জীবনটার অভাব অনুভব করা শুরু করবে। ক্ষুধা পেলেই খাবার দেয়ার জন্য মা নেই, বিকেলে আড্ডা দেয়ার জন্য পুরাতন বন্ধুরা নেই, যখন ইচ্ছা তখন ঘুম থেকে উঠার সুযোগ নেই। এইসব কিছু যখন মানিয়ে নিতে না পারার সাথে যুক্ত হবে তখনি তুমি নিজেকে একা একা মনে করবে। এটি বিদেশে পড়তে যাওয়ার একটি বড় অসুবিধা।

অতিরিক্ত প্রত্যাশা

আমাদের সবারই একটা দোষ আছে। সেটা হল বিদেশে পড়তে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত প্রত্যাশা নিয়ে যাই আমরা। যেই দেশে যাচ্ছি সেই দেশ সম্পর্কে শুধু মুভি আর ইন্টারনেটে যা দেখি সেটুকুই জানি। ফলে এমনিতেই আমরা জানি কম। আর বিদেশ নিয়ে আমাদের মাঝে একটা মোহ আছে। এর ফলে যখন আমরা বিদেশে গিয়ে বাস্তবতার সম্মুখীন হই, তখন সেই মোহটা কেটে যায়।

সেখানে গিয়ে দেখা যায় চাইলেই যেখানে সেখানে যাওয়া যায় না, বিদেশীদের জন্য সেখানে আইন কঠোর ইত্যাদি। আশাভঙ্গ হওয়ার ফলে অনেকেই সেখানে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে না।বিদেশে উচ্চশিক্ষা

ভুল পথে চলে যাওয়া:

বিদেশে পড়ালেখা করতে যাওয়ার আরেকটা বড় অসুবিধা হল ভুল পথে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পারায় যখন তুমি হতাশ, ঠিক সেই সময়টাই এই ভুল পথে চলে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে সহজ সময়। পরিবারের শাসন থেকে হঠাৎ করে মুক্তি পেলে ইচ্ছে করে অনেক কিছুই করতে। বিদেশের মুক্ত পরিবেশে তোমাকে বাধা দেয়ারও কেউ থাকবে না। এর ফলে একটা বেশ বড় সম্ভাবনা থাকে চরিত্রের অবক্ষয় হওয়ার।

পরিবারের খারাপ সময়ে পাশে না থাকতে পারা:

দেশের বাইরে পড়তে গেলে ঐ দেশের আইন বা দেশে ফেরার খরচ ইত্যাদি কারণে দেশে ঘনঘন ফেরার কোন সুযোগ থাকে না। এর ফলে দেখা যায় যে পরিবারের কোন খারাপ সময়ে বা কোন দুঃসংবাদ শুনলে দেশে ফিরে পরিবারের পাশে থাকার সুযোগ হয় না। এর ফলে মনের উপর চাপ পড়ে যাতে করে পড়ালেখার ব্যাঘাত ঘটে।

খরচ

অনেক দেশেই জীবনযাপনের খরচ অনেক বেশি যা অনেকের পরিবারের পক্ষেই চালানো সম্ভব নয়। পড়ালেখার খরচ এর পাশাপাশি জীবনযাপনের খরচ চালানোর জন্য সবাইকে পার্টটাইম চাকুরী করতে হয়। এর ফলে নিজের জন্য সময় পাওয়া যায় না। আর পার্টটাইম চাকুরী খুঁজে পাওয়াও বেশিরভাগ সময়ই কঠিন। এই আর্থিক চাপের কারণে পড়ালেখা আর আনন্দ দুটোতেই ব্যাঘাত ঘটে।

আরও পড়ুনঃ NSI তে ওয়াচার কনস্টেবল এর কাজ কি? যোগ্যতা, বেতন এবং কর্মক্ষেত্র

শেষকথা

বিদেশে পড়তে যাওয়া আমাদের অনেকের কাছেই স্বপ্ন। কিন্তু এই স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে যখন বিদেশে গিয়ে মানুষ প্রত্যাশার সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে না পায়। এজন্য আমাদের সকলেরই উচিত আগের সব সুবিধা-অসুবিধা খুঁটিয়ে দেখা, অসুবিধাগুলোর সাথে মানিয়ে নিতে পারবো কি না তা দেখা। এই সবকিছু ভেবে বিদেশে পড়ালেখার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। তাহলেই সুবিধাগুলোর সঠিক ব্যবহার আর অসুবিধাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

Leave a Comment